ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিনের সামরিক উদ্দেশ্য

Russia Ukraine War: ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিনের সামরিক উদ্দেশ্য কী?

  • Post author:
  • Post last modified:16/02/2022

ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিনের সামরিক উদ্দেশ্য: প্রবন্ধটি লন্ডন ভিত্তি ম্যাগাজিন The Economist এ প্রকাশিত What are Vladimir Putin’s military intentions in Ukraine? থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

রাশিয়ার BATTALION TACTICAL GROUP (BTG) হলো রাশিয়ার একটি সেনা ইউনিট যা ৮০০ বা তারও অধিক সৈন্য নিয়ে গঠিত, কখনও কখনও তার চেয়েও BATTALION TACTICAL GROUP মানে যুদ্ধের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় বেশিরভাগ সামরিক ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি এবং বিমান প্রতিরক্ষা কে বুঝায়। রাশিয়া যখন ২০১৪ সালে রাশিয়ার সাথে ক্রিমিয়াকে সংযুক্ত করার মধ্য দিয়ে ইউক্রেন আক্রমণ করেছিল, তখন দেশের পূর্ব প্রান্তে ডনবাসে রাশিয়ান ভাষাভাষীদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদকে জাগিয়ে তুলেছিল, আর তখন রাশিয়া তা সম্ভবত কেবল ডজন-খানেক (BTG) দিয়ে তা করেছিল। পরের বছর, যখন ডনবাসে রাশিয়ার প্রতিনিধিদের সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছিল তখন রাশি কেবল ১০ টি (BTG) দিয়েই তা করেছিল। 

এখন, রাশিয়া সরকারের তথ্য মতে ইউক্রেন সীমান্তে বা তার কাছাকাছি অন্যান্য অঞ্চলে আনুমানিক ৫৬টি (BTG) রয়েছে। আরেক হিসেবে বলা হয় সংখ্যাটি আসলে ৭০-এর উপরে। স্নায়ু-যুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে এটি ইউরোপে সামরিক শক্তির সবচেয়ে বড় কেন্দ্রীকরণ। আর শুধুমাত্র ভ্লাদিমির পুতিনই বলতে পারেন কিভাবে, বা কখনও যদি ব্যবহার হয়েই থাকে, তা কিভাবে ব্যবহার করা হবে।

জানুয়ারি ১৯ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ভ্লাদিমির পুতিন কেন ইউক্রেন আক্রমণ করতে যাচ্ছে তার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “তাকে তো কিছু একটা করতে হবে”। বিশাল ধূম্র মেঘে আগুনের সূত্রপাত হয়; যুদ্ধোদ্যোগে গতিশীলতা আসে। বাইডেন মনে করেন যে তার রাশিয়ান প্রতিপক্ষ, এতদূর যাওয়ার পরেও, তার আরও অগ্রসর হওয়া দরকার, এর অর্থ এই নয় যে পুতিন তাতে সম্মত। পুতিন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে এসেছেন যা জনাব বাইডেনের থেকে একেবারে ভিন্ন, যেখানে সমঝোতা প্রায়শই বোঝাপড়ার চেষ্টার পরিবর্তে হুমকি দিয়ে শুরু হয়। আর তিনি কারো কাছে দায়বদ্ধ নয়।

বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নির্দিষ্ট না করে, পুতিন এমনভাবে যুদ্ধের প্রকোপ কমাতে সক্ষম বোধ করতে পারেন যে কার্যদ্বারাকে ঘিরে জোট গঠন করতে হয় এমন কোনো নেতা তা করবেন না। এটা আশ্চর্যজনক যে, রাশিয়ার ভেতরে এমন অনেকে রয়েছে যারা যুদ্ধ নয়, বরং যুদ্ধের অনুপস্থিতির ভবিষ্যদ্বাণী করছ – আর যদিও যুদ্ধের অনুপস্থিতি, দার্শনিক স্পিনোজার শিক্ষার্থীরা যেমনটি প্রমাণ করতে পারে, মানে শান্তির উপস্থিতি নয়, তবুও তা পুতিনের জন্য অধিকতর কম ঝুঁকি বয়ে আনবে।

রাশিয়াই একমাত্র জায়গা নয় যেখানে লোকজন আসন্ন যুদ্ধ সম্পর্কে অবিশ্বাসী। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জনসাধারণকে বলেছেন যে পুতিনের সংঘবদ্ধতা বা যুদ্ধোদ্যোগ একধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ যা শান্ত থাকার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি মোকাবিলা  করা যায়। কয়েক বছর ধরে ডনবাসে সৈন্য হারানোটা দেশটিকে বেদনার প্রতি অভিযোগহীনতা ও উদাসীনতার নির্দিষ্ট শিক্ষা দিয়েছে।

কিন্তু ২৩ জানুয়ারি তারিখ ঘিরে উল্লেখযোগ্য উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যখন থেকে বিভিন্ন দূতাবাস কিয়েভ থেকে লোকজন প্রত্যাহার শুরু করে দেয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অল্পবয়সী সদস্যরা কিয়েভ ছেড়ে যাওয়ার জন্য বা যুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে এমন অঞ্চলগুলো থেকে পরিবারের সদস্যদের দূরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। অযৌক্তিকতার দিকে এগিয়ে গেলে অফিসিয়াল আশ্বাস খুব কমই কাজে আসে। ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান ওলেক্সি ড্যানিলভ জানুয়ারির ২৫ তারিখে জোর দিয়ে বলেন যে, রাশিয়ার সৈন্যদের গতিবিধি স্বাভাবিকের বাইরে কিছুই নয় এবং ২৬ তারিখে বলেন যে পূর্ণ মাত্রার আক্রমণ “বাস্তবিকপক্ষে অসম্ভব”। গতিবিধি সম্ভব, আর আক্রমণ না।

পুতিন এর আগেও সশস্ত্র সংঘাতকে রাজনৈতিক পুঁজি করেছেন। ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া চেচনিয়া যুদ্ধ তাকে রাষ্ট্রপতির পদে আরোহণ করতে সাহায্য করেছিল। ২০০৮ সালের জর্জিয়া যুদ্ধ, ন্যাটো-বিরোধী জাতীয়তাবাদ দ্বারা চিহ্নিত। ২০১৪ সালের ক্রিমিয়া দখল করা দেশটিতে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল।

রাশিয়া-ইউক্রেন নির্বাচিত মুহুর্ত
Russia Ukraine War: রাশিয়া-ইউক্রেন নির্বাচিত মুহুর্ত। সূত্র: The Economist.

কিন্তু তিনি বিশাল বাহিনীকে দায়বদ্ধ করা বা ভয়ঙ্কর হতাহতের ঝুঁকি নেওয়া এড়িয়ে যাচ্ছেন এবং অনেক রাশিয়ান বিরোধী রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ব্যবসায়ীরা মনে করেন যে তিনি এখন সেই পদ্ধতি পরিবর্তন করতে আগ্রহী নন। তারা পরামর্শ দেয় যে সীমান্তে  mobilisation বা সংঘবদ্ধতা যুদ্ধের পূর্বসূচী হিসেবে ইঙ্গিত দেওয়া নয়, তবে কেবলমাত্র দেশের মধ্যে সংঘাত ও সংকটের অনুভূতি তৈরি করা, এইভাবে শাসনকে খাটো করা এবং অভ্যন্তরীণ কিছু উত্তেজনা প্রকাশ করার মাধ্যমে পশ্চিমাদের বিড়ম্বনা করা। আর তার সেসব লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।

যুদ্ধের দামামা মুদ্রাস্ফীতি, ভয়ঙ্কর মহামারী এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষকে নিমজ্জিত করেছে। ন্যাটো সম্পর্কে রাশিয়ার দাবিগুলো–যে ন্যাটো যেন নতুন সদস্যদের প্রতি open-door policy ত্যাগ করে, যেন ন্যাটো পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলিতে সামরিক তৎপরতা বন্ধ করে এবং তা যেন বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা অপসারণ করে— তা উচ্চ পর্যায়ের শীর্ষ-বৈঠক সম্পর্কে স্নায়ুযুদ্ধের অচলাবস্থার সৃষ্টিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা রাশিয়ার বৃহত্তর শক্তির মর্যাদা নিশ্চিত করে আর রাশিয়া এটিকে তার প্রাপ্য হিসাবে দেখে।

রাশিয়ান মাধ্যমে ন্যাটোর এই দাবিগুলির প্রত্যাখ্যানকে জোট শক্তির দেশ সমূহ আগ্রাসী হিসেবে দেখানো হয়েছে আর পুতিনকে মাতৃভূমির নৃশংস রক্ষক হিসাবে দেখানো হয়েছে। যেমনটি, ১৯৪৬ সালে আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধ কৌশলের ভিত্তি প্রণয়ন করার সময় আমেরিকান কূটনীতিক জর্জ কেনান বলেন, রাশিয়ান জাতীয়তাবাদে  “আক্রমণ বা offence এবং প্রতিরক্ষা বা defence ’র ধারণাগুলি অবিচ্ছিন্নভাবে বিভ্রান্তিকর”।

ইউক্রেনকে আরও অস্ত্র সরবরাহের প্রতিশ্রুতি সহ পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়াগুলি সেই বিভ্রান্তিকে আরও গভীর করে তুলেছে। বিরোধী দলীয় নেতা, আলেক্সি নাভালনি, যাকে পুতিন ২০২০ সালে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, সম্প্রতি তিনি জেল থেকে লিখেছেন: “বারংবার পশ্চিমারা পুতিনের প্রাথমিক ফাঁদে পড়ে…তা আমাকে ভীষণ পুলকিত করে।”

এর সব কিছুই কেন রাশিয়ার কিছু পর্যবেক্ষক পুতিনের পক্ষে কেনো টেবিলে তাজের কার্ড রেখে পরে কোনো একসময় পুনরায় কুড়িয়ে নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে চলে যাওয়া সম্ভব হিসেবে দেখেন তা ব্যাখ্যা করে। যুদ্ধ যে রাশিয়ার অর্থনীতিকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেবে তা বিবেচনায় রেখে, পুতিনের অভ্যন্তরীণ দলের ভাগ্য এবং জনগণের মেজাজ বিবেচনা করে পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন তা না করলে তিনি পাগল ছাড়া কিছু নন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি তা করবেন। তার ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ তাদের থেকে আলাদা হতে পারে। তিনি ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন এবং কিছু কিছু বিষয় যেমন অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে  ভ্রান্ত-তথ্য পেয়ে থাকতে পারেন। তিনি হয়তো বৃহৎ দৃশ্য বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন—বা হতে পারে তিনি ভাবছেন তিনি অন্য কারো তুলনায় বৃহৎ দৃশ্য দেখেন।

দৃশ্যের একটি অংশ হল যে ২০১৪ সালে রাশিয়ান-ভাষী ইউক্রেনের দক্ষিণ ও পূর্বের সমস্ত অংশ ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য একটি ব্যাপকভাবে আলোচিত পরিকল্পনা পুতিন ব্যর্থ করেছিলেন। ক্রিমিয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং ডনবাসের অস্থিতিশীল বিদ্রোহকে একটি উত্তম পরিণতি বলে মনে হয়েছিল। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে মিনস্ক চুক্তির লক্ষ্য ছিল একটি যুদ্ধবিরতি যা দেশটির অঞ্চল সমূহে এক নতুন কেন্দ্রীয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করেছিল। যা ডনবাসের রাশিয়া-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সামগ্রিকভাবে দেশটির পক্ষে যে কোনও পশ্চিমামুখী প্রবাহকে বাধা দেওয়া সক্ষম করে তুলতো।

কিন্তু মিনস্ক চুক্তি মৃতপ্রায় এবং ইউক্রেন একটি একক রাষ্ট্র রয়ে গেছে। যদিও দেশটি পরবর্তী আট বছরে আনুষ্ঠানিক ন্যাটো সদস্যতার দিকে অগ্রসর হয়নি, তবে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে ইউক্রেন সামরিক ও অন্যভাবে অনেক উপকৃত হয়েছে, যা অব্যাহত থাকবে বলে মনে হচ্ছে।

Russian Invation Map
Copyright: The Economist

এক স্বাধীন গোঁড়া স্লাভিক দেশ হিসেবে ইউক্রেন পশ্চিমা প্রকল্পের অংশ যা পুতিন আদর্শের কর্তৃত্ববাদী রাশিয়ার সরাসরি অবমাননা; যদি সেই অবমাননাকে এড়াতে হয় তাহলে ইউক্রেনকে নিম্ন পর্যায়ের অশান্তিতে, দুর্বল ও কাপুরুষিত করে রাখতে হবে। আর ইউক্রেন যদিও ২০১৪ সালের তুলনায় আজকে কম অরক্ষিত, তবুও দেশটি আজকের মতো পুনরায় অরক্ষিত হয় পড়বে বলে মনে হয় না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খেলার রান পরিবর্তন করার জন্য এটি একটি যুক্তি। এটাও সত্যি যে  বর্তমানে রাশিয়ার বিশালাকারের War Chest, বা যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সংরক্ষিত মুদ্রা ভাণ্ডার রয়েছে, যা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার মতো উত্তম।

আত্ম-সংরক্ষণ দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে একটি যুক্তিও রয়েছে। রাশিয়ান নেতৃবৃন্দরা স্বভাবতই তাদের দেশের শত্রুদের সাথে দেশের বাইরের শত্রুদের গুলিয়ে ফেলেন। রাশিয়াকে ধ্বংস করার পশ্চিমা ষড়যন্ত্র দেশের মধ্যে “বিদেশী এজেন্ট” ব্যবহার করে এবং বিদেশে অন্যের দ্বারা ব্যবহৃত প্রতারকরা পুতিনকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাশিয়ার এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেতা হিসাবে বর্ণনা করে (যে ভূমিকাটি ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ ভূমিকা)। বিষয়টি আত্ম-সেবামূলক তবে তা নিজস্ব উপায়ে আন্তরিকও হতে পারে। কেনানকে আবার উদ্ধৃত করে বলতে হয়, রাশিয়ান নেতৃবৃন্দদরা “তারা যা স্বস্তিদায়ক এবং সুবিধাজনক মনে করে তা বিশ্বাস করতে তাদের কোনো অসুবিধা নেই”। এবং যদিও এটি ঠিক স্বস্তিদায়ক নয়, পুতিন বিশ্বাস করতে পারেন যে আমেরিকার মধ্যে তার শত্রুরা এবং তার আমেরিকার মিত্ররা সক্রিয়ভাবে তাকে প্রতিহত করার বা তার কাছ থেকে রেহায় পাওয়ার বা তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছে।

১৭ মার্চ ২০২১ তারিখে সম্প্রচারিত ABC নিউজ প্রোগ্রামে জ্যো বাইডেন তার সাক্ষাত্কারকারীর দাবির সাথে একমত হন যে পুতিন “একজন খুনি”। আমেরিকার নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ করতে চেষ্টা করার উপর গোয়েন্দাদের দেওয়া প্রমাণকে নির্দেশ করে, তিনি বলেছিলেন যে ফলশ্রুতি সরূপ পুতিনকে এর “মূল্য দিতে হবে”। পুতিন একে হয়তো এক সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। যারা প্রেসিডেন্ট পুতিনকে চেনেন তারা বলেছেন যে তিনি তার নিজের নিরাপত্তা এবং গুপ্ত হত্যার প্রচেষ্টা নিয়ে আচ্ছন্ন। কোভিড-১৯ থেকে নিজেকে বাঙ্কারে বিচ্ছিন্ন করে মাস-কয়েক জীবনযাপন সম্ভবত এতে মানসিক বৈকল্য জনিত অনুভূতির সংযোগ ঘটিয়েছে।

বাইডেনের এই মন্তব্যের দুই দিন পর পুতিন এবং তার গত এক দশক ধরে তার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সার্গেই শোইগুকে নিয়ে সাপ্তাহিক ছুটিতে চলে যান। তারা ফিরে আসার পর রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে এবং ক্রিমিয়ায় সৈন্য সমাবেশ শুরু করে। এক মাসেরও কম সময় পর, পুতিন রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে ঐতিহাসিক সংযোগ সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন যাতে বলা হয় যে ইউক্রেন আর সার্বভৌম রাষ্ট্র নয় বরং একটি সৈন্যদের দ্বারা সংরক্ষিত আমেরিকান আক্রমণ স্থল। অজুহাত সন্ধানী ব্যবহারটি হলো যে তিনি ইউক্রেনের উপর আক্রমণকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচনা করেন, যা তার শাসনকে দুর্বল করার জন্য আমেরিকার চক্রান্তের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার লড়াই।

ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিন: কোনো গুপ্তচর নয়, বরং ব্যাটালিয়নের মাধ্যমে

পুতিন যদি তার হাতে থাকা কিছু বা সমস্ত বাহিনীকে ব্যবহার করতে চান, তাহলে তা তিনি কবে করবেন? গোয়েন্দার সাথে পরিচিত একজন পূর্ব ইউরোপীয় কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত বড় কোনো আক্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পরিপূর্ণরূপে একত্রিত করা হবে না। বেলারুশের আক্রমণকারী রাশিয়ান বাহিনী- কিয়েভের উপর আক্রমণের জন্য ভালোভাবে স্থাপন করা- ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাদের পূর্ণ সৈনিক দলে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাই এখন তড়িঘড়ি করে ঘোষিত Allied Resolve নামক যৌথ “প্রশিক্ষণ”র শুরুর ‍দিন হিসেবে চিহ্নিত।

বেইজিংয়ে শীতকালীন অলিম্পিকের সময় হয়তো পুতিন তার আক্রমণ বিলম্বিত করতে পারেন; ইউক্রেনে যুদ্ধ চীনের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করবে যা এখনকার সম্পর্কে আরও উচ্চতর অগ্রাধিকার দেবে। যদি তাই হয় তাহলে তা হবে ফেব্রুয়ারি ২০ তারিখে সমাপ্ত খেলার সমাপ্তি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির সময়ের মাঝে, যা একটি অনুকূল সুযোগ। তার মানে, যদিও নরম মাটি রাশিয়ান সামরিক ট্যাঙ্ক জন্য অগ্রসর হওয়া কঠিন করে তুলবে, তবে পরবর্তী আক্রমণ অসম্ভব কিছু নয়।

ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্বল্পতা এবং তার সশস্ত্র বাহিনীর দুর্বলতার অর্থ হল রাশিয়া ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী বাগদাদে যত সহজে বাগদাদে পৌঁছেছিল ঠিক ততোটা সহজে কিয়েভের দিকে অগ্রসর হতে পারবে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান CAN’র রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষজ্ঞ মাইকেল কফম্যান মনে করেন যে, রাশিয়া কিয়েভকে দখল করা, রাজধানীর দক্ষিণের উপকূলীয় শহর ওডেসাকে নিয়ে যাওয়া এবং দেশটির পশ্চিম প্রান্ত সমূহ দখল না করে দেশটিকে বিভক্ত করা পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারে। “এটি খুবই ভয়ঙ্কর রকমের ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল হবে,”  War on the Rocks এর জন্য লিখা তার প্রবন্ধে তিনি বলেন, “ তবে তা পুতিনকে রাশিয়ার অধিকাংশ ঐতিহাসিক রাশিয়াকে পুনরুদ্ধার করা রাশিয়ান নেতা হিসেবে তৈরি করবে, এবং NATO ‘র বিরুদ্ধে এক শক্ত প্রতিরোধ স্থাপন করবে”।

যেমনটা বাগদাদে হামলার সাথে তুলনা করলে বোঝা যায়, এই পরিস্থিতিতে সমস্যা হচ্ছে রাশিয়ার জয়ের পর কি হয় তা দেখা। এক রাশিয়ান-সমর্থিত ঠগ ইতিমধ্যেই কিয়েভ থেকে গোপনে পালিয়েছে: ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ, যখন ২০১৪ সালে বিপ্লবের মুখোমুখি হয়েছিল। আক্রমণ-পরবর্তী বিদেশি দখলদার শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা-কারীদের একই পরিণতি ভোগ করা থেকে বাঁচানোর জন্য তেমন কিছুই থাকবেনা যদিনা, আগ্রাসনের পর রাশিয়া মঞ্চ ছেয়ে চলো যায়। তাই রাশিয়াকে হয় একক রাষ্ট্র ভেঙ্গে দিতে হবে অথবা গ্রহণ করতে হবে এক উন্মুক্ত দখলদারিত্ব, যার জন্য পশ্চিম ইউক্রেনের মুক্তিকামীরা  যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

আমেরিকান থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান RAND, ২০২০ সালে অনুমান করেছিল যে ডোনেটস্ক এবং খারকিভের শহরগুলো সহ পূর্ব ইউক্রেনের বিস্তৃত এলাকা দখল রাশিয়ার ৮০,০০০ বা তার বেশি সৈন্যের প্রয়োজন হবে। কিয়েভকে অন্তর্ভুক্ত করা বৃহত্তর প্রচেষ্টা অনেক বেশি সৈন্যের দরকার হবে, যা এমনকি রাশিয়ার উল্লেখযোগ্য বাহিনীকে সহজেই শুষে নিতে পারে। দিক-নির্দেশনা সম্পর্কে আশাব্যঞ্জক অনুমানের ভিত্তিতে এই ধরনের সংঘাতের মধ্যে সংকল্প-চিত্তে আক্রমণে নেমে পড়াটার ক্ষেত্রে এটিই প্রথম মহা- শক্তি নয়। তবে এই মহা- শক্তি যা চায় তা লাভ করতে গিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ উপায় লক্ষ্য করে থাকতে পারে।

এ কারণেই ইউক্রেনের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিস (CDS), এটিকে একটি প্রচলিত আগ্রাসনের পরিবর্তে একটি “hybrid invasion” বা সংকর আগ্রাসন” হিসেবে অবহিত করে। CDS’র কথা মতে এ ধরনের প্রচেষ্টা সাইবার-আক্রমণ, বিভ্রান্তিমূলক তথ্য এবং বোমা হুমকির মতো মনস্তাত্ত্বিক হুমকি কে সম্পৃক্ত করবে। স্কুল, রাজনৈতিক কার্যালয় এবং অন্যান্য অ-সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে লক্ষ্য করে ইউক্রেন জুড়ে সাম্প্রতিক কয়েক শতাধিক বোমা আতংক দেখা দিয়েছে।

ইউক্রেনের জনসংখ্যাকে মনোবলহীন এবং এর নিরাপত্তা বাহিনীকে ক্লান্ত করে দেওয়ার মাধ্যমে যদি এই ধরনের পদক্ষেপ নিজে নিজেই শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন করতে পারতো, তাহলে পুতিনের জন্য তা অনেকটা ভালো হতো। তা না হলে, এটি আরও তীব্রতর কিছুর জন্য প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে পরিণত হতে পারে।

প্রতিবেদনে ডনবাস অঞ্চলের “সশস্ত্র বৃদ্ধির” কথাও বলা হয়েছে, যার মধ্যে  বর্তমানে মাত্র ৩০%রাশিয়াপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।  দীর্ঘদিন ধরে পুতিন  দাবি করেছেন, অতি সম্প্রতি ডিসেম্বর মাসে, যে ইউক্রেনের সরকার ডনবাস অঞ্চলের রাশিয়ান ভাষী সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গণহত্যা করছে। তাদের সুরক্ষাকে ডনবাসের বাকি অংশ দখল করে নেওয়ার পেছনে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

পুতিনের দল ইউনাইটেড রাশিয়া’র নেতৃত্বদানকারী ভ্লাদিমির ভাসিলিভ  ২৬শে জানুয়ারি সংসদে বলেছিলেন যে “লুহানস্ক এবং ডোনেটস্ক অঞ্চলে সামরিক গোলাগুলি বৃদ্ধি পাচ্ছে, পুনরায় মানুষ মরছে, কষ্ট পাচ্ছে, তাদের ধন-সম্পত্তি ধ্বংস হচ্ছে…আমরা আমাদের দেশের নেতৃত্বের কাছে লুহানস্ক এবং ডোনেটস্ক প্রজাতন্ত্রকে আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য  প্রয়োজনীয় সামরিক পণ্য সরবরাহের আকারে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন জানাচ্ছি”। এটি এমন এক আবেদন যা তিনি তার না চাওয়া হলেও তিনি করতেন।। যদি গোলাগুলি অপর্যাপ্ত উসকানি হিসাবে বিবেচিত হয়, তাহলে “false flag” বা দায়বদ্ধতার প্রকৃত উৎস লুকানোর লক্ষ্যে ও অন্য দলের উপর দোষ চাপানোর জন্য সংগঠিত আক্রমণ জনিত মহড়া প্রয়োজন হতে পারে।

কয়েক বছরে ডনবাসের প্রতিরক্ষা ফাঁড়ি খুব কমই সরেছে। তাতে বলপূর্বক প্রবেশের জন্য উল্লেখযোগ্য এবং দৃষ্টি-আকর্ষক রাশিয়ান হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হবে। তবে তা কিয়েভ অভিযানের চেয়ে ছোট হবে আর বহিরাগতদের কাছে তা সম্ভবত অধিক গ্রহণযোগ্য হবে।, আমেরিকার পররাষ্ট্র দফতরের প্রধান অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছেন যে “আক্রমণাত্মক উপায়ে ইউক্রেনে যাওয়া অতিরিক্ত একটি রাশিয়ান বাহিনীও” নিষেধাজ্ঞার সূচনা করবে। তবে সকল মার্কিন মিত্রদের কঠোর ।অবস্থান নেওয়ার বলায় আমলে নেওয়া যায় না, আর পুতিন মনে করতে পারেন যে শূন্য থেকে কোনো বৃহৎ যুদ্ধের সূচনা করার চেয়ে  তিনি ছোট-খাট কোনো যুদ্ধ সম্প্রসারণ করে পার পেয়ে যাবেন। 

এসব আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও, ডনবাস দখল করার মাঝে রয়েছে একটি বড় বাধা। এটা নাও কাজে আসতে পারে। রাশিয়া এবং ইউক্রেনের উপর তার প্রবন্ধে পুতিন লিখেছেন যে “কিয়েভকে ডনবাসের কেবল প্রয়োজন নেই”।  তার মানে তাতে দুটি বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। ডনবাস দখল করাটা একটি স্বল্পমেয়াদী বিজয় হতে পারে এবং বৃহত্তর হাইব্রিড বা সংকর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বলতে হয় যে তা বর্তমান পুতিন শাসনের পতন ঘটাতে পারে। তবে মাঝারি থেকে দীর্ঘমেয়াদে তা অবশিষ্ট ইউক্রেন দ্বারা পশ্চিমের দিকে এক সংহত বা অপ্রতিবন্ধ অভিযান ত্বরান্বিত করাতে পার।

অন্য কোনো সম্ভাবনার পাশাপাশি আরও একটি সম্ভাবনাকে গ্রহণ করা যেতে পারে, যা হতে পারে পুতিন বেলারুশে যে বাহিনীর আগমন ঘটিয়েছে তাকে ব্যবহার করে দেশটির উপর নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করা। বেলারুশের রাষ্ট্রপতি আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো  অসন্তুষ্ট হলেও তিনি রাশিয়ার উপর বিভিন্নভাবে নির্ভর করেন, অন্তত তার ২০২০ সালের নির্বাচন চুরির প্রতিক্রিয়া হিসাবে শুরু হওয়া ব্যাপক প্রতিবাদকে দমন করার বেলায় না। বেলারুশের কার্যকর সংযুক্তি অবশ্যম্ভাবীরূপে নিষেধাজ্ঞার সূচনা নাও করতে পারে। তা রাশিয়াকে ইউক্রেনকে হুমকির মুখে ফেলার জন্য সুন্দরভাবে অবস্থান করবে।  আর তা পুতিনকে লিথুইনিয়া-পোল্যান্ড সীমান্তের সংকীর্ণ সংযোগ স্থল Suwalki Gap’র প্রতি  নতুন স্তরের হুমকি প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি করে দেবে, আর এভাবে অবশিষ্ট ন্যাটোর তিন বল্টিক  –লিথুইনিয়া, লাটভিয়া, এস্টোনিয়া– রাষ্ট্রের প্রতিও হুমকি দেওয়ার অনুমতি দেবে।

Russia Ukraine War: রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ :অফিসের ধৃষ্টতা

সামরিক ঝুঁকির উপর রয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি। যুদ্ধের সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই শেয়ার বাজারে পৌঁছে দিচ্ছে এবং রাশিয়ান মুদ্রার পতন হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা, যা নতুন নিষেধাজ্ঞার সূত্রপাত করবে, অনেক কিছুকে আরও মন্দ করে তুলবে। ব্যাংগুলোতে বিপর্যয়কর দৌড়াদৌড়ি হতে পারে। কারণ পশ্চিমা বিশ্বে, যেখানে সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত, সেখানে বসবাসের কারণে রাশিয়ার ধনীদের পক্ষে তাদের সন্তানদের কাছে বিষয় হস্তান্তর করা সম্ভব, দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতা অভিজাতদের জন্য খুব বিরক্তিকর হতে পারে।

রাশিয়ান জনমতে অনৈক্যের লক্ষণ দেখায়। রাশিয়ানদের এক বিশাল জনগোষ্ঠী উত্তেজনা ছড়ানো এবং রাশিয়াকে উস্কে দেওয়ার জন্য আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বকে দায়ী করে। তবে অপ্রচারের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, ইউক্রেনীয়দের প্রতি রাশিয়ানদের এক ক্রমবর্ধমান ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত রাশিয়ানরা ইউক্রেনকে একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে: “আমেরিকার দাবার গুটি”।

বহু ইউক্রেনীয়দের মৃত্যু চিন্তায় রাশিয়ানরা যে অস্বস্তি অনুভব করতে পারে তাই হয়তো ক্রেমলিনের সামরিকবাদ সমর্থনের পরিবর্তে উদ্বেগের সৃষ্টির কারণ। নির্বাচনী সংগঠন লেভাদা সেন্টারের লেভ গুডকভ সম্প্রতি লিখেছেন, “একজন সাধারণ রাশিয়ান দেশের নেতৃত্বের উন্মাদ পথের কাছে জিম্মি হতে চায় না; সে তার নিজের জীবন এবং তার আত্মীয়দের মঙ্গল নিয়ে চিন্তা করে।” অপ্রত্যাশিতভাবে দীর্ঘ ধরে চলতে থাকা টানা কোনো যুদ্ধ, যে যুদ্ধে কেবল  ইউক্রেনীয়রাই মরবে তা নয়, বরং হাজার হাজার তরুণ রাশিয়ান মারা যাবে সে যুদ্ধ ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

তাই রাশিয়ার অনেকের মধ্যে বিশ্বাস, পুতিনকে আর সামনে অগ্রসর না হওয়ার পরামর্শ দিতে হবে। সমস্যা হল পুতিন পরামর্শ খুঁজছেন না। সে তার নিজের মনকে অনুসরণ করবে।

Romzanul Islam

Thinking out of the convention and moving forward with knowledge and reasons are always my styles. Researching, watching the best films, reading and collecting the best books to enrich me is my deadly passion. Stoicism, liberalism, feminism and aversion to material success are my ideals.

Leave a Reply