শিল্পকর্ম জগতে সবচেয়ে বড় জালিয়াতি | Greatest Forgery in Art History

শিল্পকর্ম জগতে সবচেয়ে বড় জালিয়াতি | Greatest Forgery in Art History


সম্ভবত এটিই ছিল শিল্প ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রতারণা বা জালিয়াতি। হান ভন মিয়ারেনহান ভন মিয়ারেন ছিলেন একজন অসন্তুষ্ট শিল্পী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে নেদারল্যান্ডসে সমালোচকরা কঠোরভাবে তার চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর সমালোচনা করেছিলেন। একজন সমালোচক তাকে “একজন প্রতিভাবান প্রযুক্তিবিদ হিসাবে বর্ণনা করেছেন যিনি রেনেসাঁ চিন্তা-তেচনার এক ধরনের সমন্বিত অবিকল প্রতিরূপ তৈরি করেছেন, মৌলিকতা বা কর্মের আসল রূপ ব্যতীত তার সমস্ত গুণ রয়েছে।”

আক্রমণে বিদ্ধ হয়ে ভন মিয়ারেন পালটা আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিখ্যাত ডাচ শিল্পী জোহানেস ভার্মিরের শৈলীর আদলে সমৃদ্ধি একটি চিত্র আঁকেন, যার শিরোনাম ছিল “The Supper at Emmaus” বা “এমাউসে ভোজ”, এবং চিত্রটি তিনি বিশিষ্ট সমালোচক আব্রাহাম ব্রেডিয়াসের কাছে দাখিল করেন। 

ব্রেডিয়াস প্রলুব্ধ হয়ে লিখেন “একজন শিল্পপ্রেমীর জীবনের এটি এক চমৎকার মুহূর্ত যখন তিনি হঠাৎ করে নিজে একজন মহা গুরুর অজানা চিত্রকর্মের মুখোমুখি হন ... এ কী এক চিত্র! আমি বলতে চাই যে ডেল্ফট শহরের জোহানেস ভার্মিরের চিত্রকর্ম আজ আমাদের মাঝে বিদ্যমান।”  পুরো চিত্রশিল্পের জগৎ কেঁপে উঠে তাতে আর তার চিত্রকর্মটি কয়েক মিলিয়ন ডলার সমমূল্যে বিক্রি হয়, আর দক্ষিণ নেদারল্যান্ডের প্রধান শহর রোটারডামের বোইজম্যানস গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়।

হ্যান ভন মিয়ারেন গ্যালারির ৪০০ বছরের ইউরোপীয় শিল্প প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তার জালিয়াতির বিষয়টি উন্মোচন করার পরিকল্পনা করেন, যেখানে তার জালিয়াতিকে গর্বের স্থান দেওয়া হয়। এতে করে তার সমালোচকরা অপমানিত হতো এবং দারুণভাবে তাদের খ্যাতি নষ্ট হতো। 

তবে লোভ তাকে ভালোভাবে পেয়ে বসেছিল। জালিয়াতেকে উন্মোচন করার পরিবর্তে, তিনি বিভিন্ন জালিয়াতি শিল্পকর্ম দিয়ে সহজে কয়েক মিলিয়ন ডলার উপার্জন করে ফেলেন। ইউরোপ জুড়ে যখন নাৎসিরা ছড়িয়ে পড়ে তখন তিনি এমনকি তাদের কাছেও The Supper at Emmaus চিত্রটি বিক্রি করতে সক্ষম হন।

এসবের কারণে তার ব্যর্থতার প্রমাণিত হয়। যুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্র বাহিনীরা নাৎসিদের দ্বারা সংগৃহীত সমস্ত শিল্পকর্ম তাদের পূর্ববর্তী মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে । 

একটি ক্রয় রসিদ ও ভ্যান মেগিরেনের আঁকা Jesus With Adulteress এর উৎস ধরে দু’জন মিত্র বাহিনীর আর্ট কমিশনের দুই সৈন্য ভ্যান মিগারেনের স্টুডিওতে চলে যান। তারা কার কাছ থেকে ভ্যান মিগারেন ভার্মিরের শিল্প কর্মটি ক্রয় করেছিলেন তা জানতে চান। 

সত্য না বলার কারণে ভন মিয়ারেনকে নেদারল্যান্ডের জাতীয় সম্পদ জার্মানদের কাছে বিক্রি করার দায় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হন। মৃত্যুর মুখোমুখি কারাগারে বন্দী অবস্থায় ভন মিয়ারেনের মনের পরিবর্তন হয়। 

তিনি ভার্মিরের চিত্রকর্মটি জাল করার কথা স্বীকার করলেও কেউ তাকে বিশ্বাস করেনি। তিনি আদালতে বলেন যে যে চিত্রটি জার্মান রাজনীতিবিদ গোয়েইং এর কাছে রয়েছে তা ভার্মিরের নয় বরং তার আঁকা।

বিশেষজ্ঞরা সাক্ষ্য দিয়ে বলেন যে কাজটি প্রকৃতপক্ষে ডাচ মাস্টার ভার্মিরের একটি মূল কাজ। কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য ভার্মিরের চিত্রটির আরেকটি নকল কপি এঁকে দেখানোও ছিল মিয়ারেনের একমাত্র উপায়। যা তিনি আক্ষরিক অর্থে কয়েক সপ্তাহ ধরে তার জীবন বাঁচানোর জন্য চিত্রটি এঁকেছিলেন। 

গল্পের চূড়ান্ত মোড়টি হল চিত্রটি নকল করার মাধ্যমে ভ্যান মিয়ারেনকে কেবল বেকসুর খালাস দেওয়া হয়নি, বরং নাৎসিদের বোকা বানিয়ে জাল চিত্র বিক্রি করার জন্য এবং দুর্নীতিগ্রস্ত শাসক হিসেবে প্রমাণ করার জন্য তিনি একজন নেদারল্যান্ডের জাতীয় নায়কে রূপান্তরিত হন। 


সূত্র: “The forger who fooled the world” The Telegraph. ইংরেজি থেকে অনুবাদিতঅনুবাদিত

.


Post a Comment

Previous Post Next Post